মিলাদ আমাদের সমাজে ব্যাপক প্রচলিত একটি জঘন্য বিদআত। এই বিদআত বর্জন করা অপরিহার্য

প্রশ্ন: মিলাদ পড়ানো যাবে কি? যেমন: বিয়ের পূর্বে, বাড়ির কল্যাণ, শারীরিক সুস্থতা কামনা ইত্যাদি উদ্দেশ্যে?

উত্তর:
বিয়ের পূর্বে, বিয়ে পড়ানোর পরে, নতুন বাড়ি, গাড়ি, দোকান, কোম্পানি উদ্বোধন, বাড়ির কল্যাণ কামনা, কারো অসুস্থতা কামনা, মৃত্যু বার্ষিকী, চল্লিশা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্ম উৎসব (ঈদে মিলাদুন্নবী), বিশেষ কোন দিবস পালন বা বিশেষ কোনো উপলক্ষে মিলাদ পালন করা সম্পূর্ণ বিদআত। অথচ এটি আমাদের সমাজে ব্যাপক প্রচলিত রয়েছে!
প্রকৃতপক্ষে ইসলামে এ মিলাদের কোনো অস্তিত্ব নাই। ইসলামের সোনালী অধ্যায়ের তিন শতাব্দী তথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগ, সাহাবীদের যুগ এবং তাবেঈনের যুগ পার হয়ে গেলেও ইতিহাসে কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না যে, কোন একজন সাহাবী, তাবেঈ বা তাবে তাবেঈ মিলাদ উদযাপন করেছেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি তাদের ভালবাসা কি কম ছিল না কি তারা ইসলাম বুঝতেন না? কখনও নয়। বরং তাঁরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রচণ্ড ভালবাসতেন। তারা ছিলেন তার সুন্নত-আদর্শ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী এবং শরীয়তের বিধিবিধান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অগ্রগামী।

 মিলাদের উৎপত্তি কিভাবে হল?

ঐতিহাসিকগণ বলেন, যারা সর্বপ্রথম এই বিদআতকে রূপদান করে তারা হল, বনী উবাইদ আল কাদ্দাহ। এরা নিজেদেরকে ফাতেমী বলে অবিহিত করত এবং নিজেদেরকে আলী রা. এর বংশধর বলে দাবী করত। এরাই ফাতেমী দাওয়াতের প্রতিষ্ঠাতা। (আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ১১/২০২)
ইসলামের নামে মিলাদ প্রচলনে এই ফাতিমীদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হল, দ্বীন ইসলামের মাঝে পরিবর্তন সাধন করে তার মধ্যে এমন কিছু ঢুকানো যার অস্তিত্ব দ্বীনের মধ্যে ছিল না। কারণ, ইসলামী শরীয়ত এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নত থেকে মানুষকে দূরে সরানোর সব চেয়ে সহজ পদ্ধতি হল, তাদেরকে বিদআতের মধ্যে ব্যস্ত রাখা।

ইতিহাসবিদদের মতে, এদের অবস্থান ইসলাম থেকে শুধু দূরেই নয় বরং এরা ইসলাম ও মুসলমানদের ঘোরতর দুশমনও যদিও এরা বাহ্যিক ভাবে তা স্বীকার করে না।

 সউদী আরবের সাবেক প্রধান মুফতি শাইখ মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহীম আলুশ শাইখ রহ. বলেন, “হিজরি ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে এই বিদআত তথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্ম দিবস পালনের প্রথা সর্ব প্রথম চালু করেন আবু সাঈদ কূকুবূরী। [ফাতাওয়া ওয়া রাসায়েল ৩/৫৯]
যদিও এ মর্মে অন্য আরও একাধিক মত রয়েছে।

 উবাইদিয়াদের শাসনামলে মিলাদ চালু হওয়ার পর ধীরে ধীরে তা ব্যাপকতা লাভ করতে লাগল। মুসলমানগণ জিহাদ ছেড়ে দিল এবং তারা রূহানী ভাবে দুর্বল হয়ে পড়ায় এই বিদআতটি সাধারণ মানুষের মনে শিকড় গেড়ে বসল। এমনকি অনেক মূর্খ মানুষের নিকট এটা আকীদা-বিশ্বাসের একটি অংশ হয়ে দাঁড়ালো।

কিছু আলেম যেমন ইমাম সুয়ূতী রহঃ এই বিদআতের পক্ষে প্রমাণাদি খুঁজতে বাধ্য হলেন যাতে মীলাদের বিদআতকে বৈধতা দেয়া যায়। (তিনি মিলাদের পক্ষে কতিপয় দলিল পেশ করেছেন। কিন্তু অন্যান্য আলেমগণ তার যথপযুক্ত জবাব দিয়েছেন -আল হামদুলিল্লাহ।
[এ প্রসঙ্গে তার দলিলগুলোর পর্যালোচনা ও সেগুলোর জবাবে আলাদা একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে SalafiBD ওয়েব সাইটে।]
আবার অনেক আলেম একদিকে সরকারের ভয়ে অন্য দিকে জন সাধারণের মাঝে ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়ার আশংকায় এ বিদআতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে না পেরে নীরবতা অবলম্বন করলেন।

🌀 মিলাদ কেন বিদআত?

মিলাদের যদি কোন উপকার থাকত তবে অবশ্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অবশ্যই তাঁর উম্মতকে স্পষ্টভাবে তা পালন করার কথা বলে যেতেন। কারণ দুনিয়া-আখিরাতের এমন কোন কল্যাণকর দিক নেই যা তিনি তার উম্মতকে বলে দেন নি কিংবা এমন কোন ক্ষতিকর দিক নেই যে ব্যাপারে সাবধান করেন নি।

বরং তিনি দ্বীনের ভিতর নতুন নতুন বিদআত তৈরি করার ব্যাপারে কঠিন ভাবে সতর্ক করে গেছেন।

🔹 তিনি বলেন:
وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الأُمُورِ، فَإِنَّ كُلَّ بِدْعَةٍ ضَلالَةٌ

“দ্বীনের মধ্যে নতুন সৃষ্ট বিষয়াদি থেকে সাবধান! কারণ প্রতিটি নতুন আবিষ্কৃত বিষয়ই গোমরাহি।[মুসতাদরাক, কিতাবুল ইলম, আলবানী রা. হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন। দেখুন: সিলসিলা সাহীহা (সহীহ হাদিস সিরিজ) হাদিস নং ২৭৩৫।

🔹 তিনি বিভিন্ন সময় বক্তৃতা দেয়ার শুরুতে বলতেন:

أَمَّا بَعْدُ: فَإِنَّ خَيْرَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللَّهِ وَخَيْرُ الْهُدَى هُدَى مُحَمَّدٍ وَشَرُّ الأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا وَكُلُّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ

“অতঃপর,সর্বোত্তম বাণী হল আল্লাহর কিতাব। আর সর্বোত্তম নির্দেশনা হচ্ছে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নির্দেশনা। সব চেয়ে নিকৃষ্ট জিনিস হল দ্বীনের মধ্যে নতুন আবিষ্কৃত বিষয়াদি। আর প্রতিটি নতুন বিষয়ই ভ্রষ্টতা। [সহীহ মুসলিম, অনুচ্ছেদ: নামায এবং খুতবা সংক্ষিপ্ত করা।]

(আল বিদা আল হাওলিয়া কিতাব থেকে পোস্টের মূল কথাগুলো নেওয়া হয়েছে)

যাহোক, বাড়ির কল্যাণ, দাম্পত্য জীবনের সুখ, সম্পদে বরকত ও মৃত ব্যক্তিদের মাগফিরাতের উদ্দেশ্যে করণী হল, আল্লাহর বিধান অনুযায়ী সব কিছু পরিচালনা করা এবং বিপদাপদ থেকে রক্ষা,আল্লাহর রহমত, বরকত ও কল্যাণের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করা। দুআর চেয়ে উত্তম আর কিছু নেই। অসুখ-বিসুখ ও বিপদাপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যে দুআ করার পাশাপাশি দান-সকদা করাও খুব কার্যকর ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বিদআত থেকে হেফাজত করুন। আমীন।
▬▬▬🌐💠🌐▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
শাইখ আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব

Share This Post